আপনার ফ্ল্যাট আসলে কত আয় করে: ভাড়া বনাম খরচ
হাতে পাওয়া ভাড়া মানেই লাভ না। মেরামত, বিল, হোল্ডিং ট্যাক্স, খালি থাকা মাস আর অ্যাডভান্স কীভাবে হিসাবে ধরবেন, ঢাকার একটা ফ্ল্যাটের উদাহরণসহ।
ceKapsys-এর Griho টিমপড়তে ৬ মিনিট
"ফ্ল্যাটটা থেকে মাসে ২৫,০০০ টাকা আসে।" প্রায় সব বাড়িওয়ালাই এমন কিছু বলেন, আর কথাটা প্রায় কখনোই পুরোপুরি সত্যি না। ভাড়া হলো ভাড়াটিয়া যা দেন। ফ্ল্যাট যা আয় করে, তা হলো সারা বছরে এর সব খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, যে মাসগুলোতে কেউ থাকেনি সেগুলোসহ।
এই গাইডে দেখানো হলো ফ্ল্যাটের আসল আয় কীভাবে বের করবেন, কোন খরচগুলো ধরবেন, অ্যাডভান্স কীভাবে দেখবেন, আর ঢাকার একটা সাধারণ ফ্ল্যাটের উদাহরণ। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; আপনার ফ্ল্যাটের সংখ্যা আলাদা হবে, আর রিটার্নে যা জমা দেবেন তা একজন ট্যাক্স পরামর্শককে দিয়ে দেখিয়ে নিন।
পাওয়া ভাড়া মানেই লাভ না
"ভাড়া" আর "আয়"-এর মধ্যে তিনটা জিনিসের তফাত:
- খরচ। সার্ভিস চার্জ, মেরামত, রং করা, হোল্ডিং ট্যাক্স, ভাড়াটিয়ার হয়ে দেওয়া বিল, দালালি।
- খালি থাকা। দুই ভাড়াটিয়ার মাঝের মাসগুলো, যখন ভাড়া আসে না কিন্তু সার্ভিস চার্জ ঠিকই দিতে হয়।
- বকেয়া আর ছাড়। যে ভাড়া পাওনা ছিল কিন্তু কখনো আসেনি, বা যা আপনি মাফ করেছেন।
বছরজুড়ে এগুলো সহজেই মূল ভাড়ার ১৫% থেকে ৩০% খেয়ে ফেলতে পারে। মাসে ২৫,০০০ টাকা ধরে যিনি হিসাব করেন, তিনি হয়তো আসলে চলছেন ১৮,০০০ থেকে ২১,০০০ টাকায়।
নগদ ভিত্তিতে গুনুন
সহজ রাখুন, টাকা যখন সত্যিই হাতবদল হয়, তখনই গুনুন:
- ভাড়া আয় হয় যে মাসে হাতে এল, সেই মাসে। সেপ্টেম্বরের ভাড়া ২ অক্টোবর এলে সেটা অক্টোবরের আয়।
- খরচ ধরা হয় যেদিন দিলেন।
- আপনার দেওয়া বিল ধরা হয় যে মাসের বিল, সেই মাসে।
একে বলে নগদ ভিত্তি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাড়িওয়ালা এভাবেই হিসাব রাখেন, আর আয়কর রিটার্নে ভাড়ার আয় নিয়েও এভাবেই জানতে চাওয়া হয়। এর বড় সুবিধা: কিছুই আন্দাজে ধরতে হয় না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটা পেমেন্ট আছে, যা দেখানো যায়।
যে খরচগুলো ধরবেন
ফ্ল্যাটের এক বছরের হিসাব ঘেঁটে এর জন্য যত টাকা দিয়েছেন, সব লিখুন। ঢাকার একটা অ্যাপার্টমেন্টে সাধারণ খরচ:
- সার্ভিস চার্জ, যদি আপনি দেন: দারোয়ান, লিফট, জেনারেটর, পরিষ্কার। বিল্ডিং অনুযায়ী প্রায়ই মাসে ২,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা।
- মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণ: প্লাম্বিং, বিদ্যুতের কাজ, গিজার, দরজার তালা।
- দুই ভাড়াটিয়ার মাঝে রং আর সংস্কার।
- সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স, সাধারণত বছরে একবার।
- আপনার দেওয়া ইউটিলিটি বিল, যা ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেননি।
- নতুন ভাড়াটিয়া খোঁজার দালালি।
- আইনি খরচ, যেমন চুক্তি লেখা বা স্ট্যাম্প।
যা ধরবেন না:
- ভাড়াটিয়া নিজে যে বিল দিয়েছেন। ওটা আপনার খরচ না।
- যে বিলের টাকা ভাড়াটিয়া ফেরত দিয়েছেন। আপনি দিয়েছেন, টাকা ফেরতও পেয়েছেন, তাই শেষমেশ শূন্য। লিখে রাখলে ফেরতের টাকাটা অন্যান্য আয় হিসেবে লিখুন।
- আপনার লোনের কিস্তি। সংসারের বাজেটে এটা জরুরি, কিন্তু ফ্ল্যাট চালানোর খরচ না। ফ্ল্যাট নিজে কত আয় করে দেখতে হলে এটা আলাদা রাখুন।
অ্যাডভান্স আয় না
এটাই সবচেয়ে সাধারণ ভুল, আর এতে একসঙ্গে দুই বছরের হিসাব গুলিয়ে যায়।
ওঠার সময় ভাড়াটিয়া যে অ্যাডভান্স দেন, সেটা তাঁরই টাকা, আপনার কাছে রাখা। চলে যাওয়ার সময় ফেরত যাবে, কিংবা শেষ মাসগুলোর ভাড়া বা ক্ষতির জন্য কাটা হবে। যে বছর পেলেন সেই বছর ৳৫০,০০০ অ্যাডভান্সকে আয় ধরলে বছরটা আসলের চেয়ে ৳৫০,০০০ ভালো দেখায়। আর ফেরত দেওয়ার বছর দেখায় ৳৫০,০০০ খারাপ।
সমাধান: অ্যাডভান্স আলাদা একটা সংখ্যা হিসেবে রাখুন, "অগ্রিম জমা", আয়ের সঙ্গে যোগ করবেন না। আয় হয় শুধু তখনই, যখন এর কিছু অংশ সত্যিই ব্যবহার হয়:
- নোটিশের সময় ভাড়ায় কাটা অ্যাডভান্স সেই মাসের ভাড়া আয়।
- বাসা ছাড়ার দিন ক্ষতি বা বাকি বিলের জন্য কেটে রাখা টাকা হিসাব মেলানোর দিনের অন্যান্য আয়।
- ফেরত দেওয়া অংশ কখনো আয় না।
খালি থাকা: চুপচাপ খরচ
দুই ভাড়াটিয়ার মাঝে দুই মাস খালি থাকা ফ্ল্যাট দুই মাসের ভাড়া হারায়। সার্ভিস চার্জ তখনো দিতে হয়, প্রায়ই রংও করাতে হয়। তাই ভাড়া হওয়ার হার দেখা কাজের: যত মাস খালি পাওয়া যেত তার মধ্যে কত মাস ভাড়া ছিল।
- ১২ মাসের ১২ মাসই ভাড়া: ১০০%
- ১২-র মধ্যে ১০: ৮৩%
- ১২-র মধ্যে ৯: ৭৫%
৮৩% হারে মাসে ২৫,০০০ টাকার ফ্ল্যাট বছরে আনে ২,৫০,০০০ টাকা, ৩,০০,০০০ না। ভাড়া ২,০০০ টাকা বাড়ানোর আগে ভেবে দেখুন, বেশি ভাড়ার কারণে আরেকটা মাস খালি পড়ে থাকবে কি না।
আদায়: পাওনা ভাড়া বনাম পাওয়া ভাড়া
আরেকটা যে হিসাবে নজর রাখা দরকার, সেটা ভাড়া আদায়ের হার: একটা সময়ে যত ভাড়া পাওনা ছিল, তার মধ্যে কত এল। ৩,০০,০০০ টাকা পাওনা থাকলে আর ২,৮৫,০০০ এলে হার ৯৫%। যে মাসগুলো ইচ্ছে করে মাফ করেছেন, যেমন ঈদের ছাড় বা মেরামতের বদলে এক মাসের ভাড়া, সেগুলো বাদ রাখুন, যাতে ভাড়া না দেওয়ার মতো না দেখায়।
আদায়ের হার কমতে থাকা একটা আগাম সংকেত। সাধারণত বোঝায় কোনো একজন ভাড়াটিয়া পিছিয়ে পড়ছেন, আর এক মাসে সেটা সামলানো তিন মাসের চেয়ে অনেক সহজ।
একটা উদাহরণ
মোহাম্মদপুরে তিন বেডরুমের একটা ফ্ল্যাট, মাসে ২৫,০০০ টাকা ভাড়া। সার্ভিস চার্জ, মাসে ৩,০০০ টাকা, বাড়িওয়ালা দেন। ফেব্রুয়ারির শেষে ভাড়াটিয়া চলে গেলেন, মার্চে রং করানোর জন্য ফ্ল্যাট খালি থাকল। ১ এপ্রিল একই ভাড়ায় নতুন ভাড়াটিয়া উঠলেন।
| আয় | টাকা |
|---|---|
| পাওয়া ভাড়া, ১১ মাস | ৳২,৭৫,০০০ |
| ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেওয়া বিদ্যুৎ বিল | ৳২,৪০০ |
| মোট আয় | ৳২,৭৭,৪০০ |
| খরচ | টাকা |
|---|---|
| সার্ভিস চার্জ, ১২ মাস | ৳৩৬,০০০ |
| মার্চে রং | ৳১৮,০০০ |
| প্লাম্বিং আর ছোটখাটো মেরামত | ৳৪,৫০০ |
| ভাড়াটিয়ার হয়ে দেওয়া বিদ্যুৎ বিল (ওপরে ফেরত পাওয়া) | ৳২,৪০০ |
| হোল্ডিং ট্যাক্স | ৳৬,৫০০ |
| নতুন ভাড়াটিয়ার জন্য দালালি | ৳১২,৫০০ |
| মোট খরচ | ৳৭৯,৯০০ |
নিট আয়: ৳২,৭৭,৪০০ − ৳৭৯,৯০০ = ৳১,৯৭,৫০০, মাসে প্রায় ১৬,৪৬০ টাকা।
অ্যাডভান্স এখানে নেই। চলে যাওয়া ভাড়াটিয়ার ৳৫০,০০০ অ্যাডভান্সে তাঁর শেষ দুই মাসের ভাড়া মিটেছে (পাওয়া ১১ মাসের মধ্যেই ধরা)। নতুন ভাড়াটিয়ার ৳৫০,০০০ অ্যাডভান্স আছে "অগ্রিম জমা"-য়, আয়ের বাইরে।
অর্থাৎ "২৫,০০০ টাকা আসে" এমন ফ্ল্যাটটা আসলে আয় করেছে তার প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ। ফলটা খারাপ না, কিন্তু সংসারের বাজেট করার জন্য একেবারে অন্য একটা সংখ্যা।
সংখ্যাটা দিয়ে কী করবেন
ফ্ল্যাটের আসল আয় জানা থাকলে কয়েকটা সিদ্ধান্ত সহজ হয়:
- ভাড়া ঠিক করা। মূল ভাড়া না, নিট আয় মেলান একই রকম ফ্ল্যাটের সঙ্গে।
- মেরামত বনাম খালি থাকা। ভালো ভাড়াটিয়াকে রাখতে ১৫,০০০ টাকা খরচ করা প্রায়ই এক মাস খালি থাকার চেয়ে সস্তা।
- ভাড়াটিয়া বাছাই। একটু কম ভাড়ায় নির্ভরযোগ্য ভাড়াটিয়া বছরে বেশি আয় দিতে পারেন, দেরিতে দেওয়া আর আগেভাগে চলে যাওয়া বেশি ভাড়ার ভাড়াটিয়ার চেয়ে।
- ট্যাক্স। আয়বর্ষ (জুলাই থেকে জুন) ধরে আয় আর খরচ আগে থেকেই যোগ করা থাকলে রিটার্ন তৈরি মানে শুধু সংখ্যাগুলো তুলে দেওয়া।
সংখ্যাগুলো নিজেরাই যোগ হোক
বছরে একবার স্প্রেডশিটে এটা করা ভালো। প্রতি মাসে, প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য করতে গেলেই অ্যাপের দরকার পড়ে। Griho ঠিক ওপরের নগদ ভিত্তিতেই গোনে: ভাড়া যেদিন আসে, বিল তার মাসে, খরচ যেদিন দেওয়া, আর অ্যাডভান্স আলাদা, শুধু ব্যবহার হলে গোনা হয়। ড্যাশবোর্ডে প্রতিটি ফ্ল্যাট আর সব মিলিয়ে আয়, খরচ, নিট, ভাড়া হওয়ার হার আর ভাড়া আদায় দেখায়। রিপোর্ট পাওয়া যায় পিডিএফ, এক্সেল, আর আয়বর্ষের ট্যাক্স সামারি হিসেবে। দেখুন প্রতিটি ফ্ল্যাট আসলে কত আয় করে।
ছোট চেকলিস্ট
- ভাড়া গুনুন হাতে আসলে, খরচ দিলে, বিল তার মাসে
- ফ্ল্যাটের সব খরচ লিখুন, রং আর দালালিসহ
- ভাড়াটিয়ার সরাসরি দেওয়া বা ফেরত দেওয়া বিল বাদ রাখুন
- অ্যাডভান্স সত্যিই ব্যবহার না হওয়া পর্যন্ত আয়ে ধরবেন না
- শুধু ভাড়া না, ভাড়া হওয়ার হার আর আদায়ের হারও দেখুন
- প্রতিটি ফ্ল্যাটের বছরের নিট আয় বের করে সেটা ধরে পরিকল্পনা করুন