ঢাকার ফ্ল্যাটে সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিল: বাড়িওয়ালার গাইড
সার্ভিস চার্জ কে দেবেন, প্রিপেইড আর পোস্টপেইড মিটারে হিসাব কীভাবে বদলায়, আর ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে বিলের টাকা ঝগড়া ছাড়া কীভাবে নেবেন।
ceKapsys-এর Griho টিমপড়তে ৬ মিনিট
ঢাকার ফ্ল্যাটে প্রতি মাসে শুধু ভাড়ার টাকাই হাতবদল হয় না। আছে বিল্ডিংয়ের সার্ভিস চার্জ, ডেসকো বা ডিপিডিসির বিদ্যুৎ, তিতাসের গ্যাস, ওয়াসার পানি, আর প্রায়ই ইন্টারনেট। কোনটা কে দেবেন, কীভাবে দেবেন, এ নিয়ে বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটিয়ার মধ্যে ছোটখাটো তর্ক ভাড়ার চেয়েও বেশি হয়।
এই গাইডে দেখানো হলো এই চার্জগুলো সাধারণত কীভাবে চলে, বাড়িওয়ালা হিসেবে আপনার কী কী বিকল্প আছে, আর ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে পাওনা টাকা ঝামেলা ছাড়া নেওয়ার একটা সহজ উপায়। প্রতিটি বিল্ডিং আলাদা, আর শেষ কথা আপনার চুক্তি। লক্ষ্য হলো এমন চুক্তি লেখা, যাতে আন্দাজ করার কিছু না থাকে।
সার্ভিস চার্জ: কীসের জন্য দেওয়া
ঢাকার বেশিরভাগ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে একটা ফ্ল্যাট মালিক সমিতি বা বিল্ডিং কমিটি থাকে, যারা প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসিক সার্ভিস চার্জ তোলে। সাধারণত এতে থাকে:
- দারোয়ান আর কেয়ারটেকারের বেতন
- লিফট, তার বিদ্যুৎ আর রক্ষণাবেক্ষণ
- জেনারেটর, ডিজেল আর সার্ভিসিং
- সিঁড়ি, লবি আর ছাদ পরিষ্কার
- কমন এরিয়ার আলো আর পানির পাম্প
- কখনো কখনো পুরো বিল্ডিংয়ের পানির বিল
অঙ্কটা ঠিক করে কমিটি, আপনি না, আর বছরের মাঝেও বদলাতে পারে, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে-কমলে।
সার্ভিস চার্জ কে দেবেন?
দুটো প্রচলিত ব্যবস্থা আছে, চুক্তিতে কোনটা লেখা থাকলে দুটোই ঠিক আছে:
১. ভাড়ার মধ্যেই সার্ভিস চার্জ। ভাড়াটিয়া একটাই অঙ্ক দেন, ধরুন ৳৩০,০০০, আর কমিটিকে দেন আপনি। ভাড়াটিয়ার জন্য সহজ। ঝুঁকি আপনার: লিজের মাঝখানে কমিটি চার্জ বাড়ালে আপনার আয় কমে যায়।
২. সার্ভিস চার্জ আলাদা। ভাড়া ৳২৭,০০০, সঙ্গে সার্ভিস চার্জ, এখন ৳৩,০০০। ভাড়াটিয়া হয় সরাসরি কমিটিকে দেন, নয়তো আপনাকে দেন আর আপনি কমিটিকে পৌঁছে দেন। চার্জ বাড়লে ভাড়াটিয়া নতুন অঙ্ক দেন।
যেটাই বাছুন, চুক্তিতে তিনটা কথা লিখুন: চার্জ ভাড়ার মধ্যে কি না, এখনকার অঙ্ক কত, আর কমিটি বদলালে কী হবে। ভাড়াটিয়া আপনার মাধ্যমে দিলে রসিদে সার্ভিস চার্জ ভাড়া থেকে আলাদা লাইনে লিখুন।
বিদ্যুৎ: প্রিপেইড না পোস্টপেইড, তাতেই সব বদলায়
ঢাকার বেশিরভাগ নতুন সংযোগ এখন প্রিপেইড মিটারে, আর পুরোনো কিছু ফ্ল্যাটে এখনো পোস্টপেইড, মাসে মাসে বিল আসে।
প্রিপেইড মিটার। ভাড়ার জন্য সবচেয়ে সহজ ব্যবস্থা। ভাড়াটিয়া নিজেই অ্যাপ, বিকাশ বা ভেন্ডর থেকে রিচার্জ করেন, আর যতটুকু কেনেন ততটুকু খরচ করেন। মাসিক বিলে আপনার কোনো ভূমিকাই নেই। বাসা ছাড়ার দিন মিটারে কত ব্যালান্স আছে লিখে রাখুন। আগে থেকে ঠিক করে নিন বাকি ব্যালান্স পরের ভাড়াটিয়ার জন্য রেখে দেওয়া হবে, যা ছোট অঙ্কের বেলায় স্বাভাবিক, নাকি দুজনে মিটিয়ে নেবেন।
পোস্টপেইড মিটার। বিল আসে মিটার যাঁর নামে তাঁর নামে, সাধারণত আপনার, তাই বিদ্যুৎ অফিসের কাছে দায় আপনার। ন্যায্য নিয়ম:
- ভাড়াটিয়া তাঁর ব্যবহারের সময়ের আসল বিলটাই দেবেন, এক টাকাও বেশি না
- ঠিক করা ব্যবস্থামতো আপনি বা ভাড়াটিয়া শেষ তারিখের আগে বিল দেবেন
- ওঠা আর নামার দিন মিটার রিডিং লিখে দুজনেই সই করবেন
বিদ্যুতের বিলে লাভ যোগ করবেন না। আসল বিলের চেয়ে বেশি নেওয়া ভাড়াটিয়ার বিশ্বাস হারানোর সবচেয়ে দ্রুত উপায়, আর কয়েকশো টাকার জন্য সেটা খুব কমই পোষায়।
শেয়ার করা মিটার। কিছু পুরোনো বিল্ডিংয়ে দুই ইউনিটের, বা ফ্ল্যাট আর ছাদের ঘরের একটাই মিটার। কীভাবে ভাগ হবে লিখে রাখুন: সাব-মিটার থাকলে তার রিডিং অনুযায়ী, না থাকলে নির্দিষ্ট ভাগে। ব্যবহার অনেক বদলালে আবার ঠিক করে নিন।
গ্যাস: নির্দিষ্ট বিল আর প্রিপেইড মিটার
ঢাকার অনেক ফ্ল্যাটে এখনো চুলা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাসিক গ্যাস বিল, তিতাস ঠিক করে দেয়, কতটা গ্যাস খরচ হলো তা যাই হোক। নতুন এলাকা আর কিছু বিল্ডিংয়ে আছে প্রিপেইড গ্যাস মিটার, প্রিপেইড বিদ্যুতের মতোই।
- নির্দিষ্ট বিল হলে ঠিক করুন কে দেবেন, আর আপনি দিলে ভাড়াটিয়ার মাসিক মোটের সঙ্গে যোগ করুন।
- প্রিপেইড মিটার হলে ভাড়াটিয়া রিচার্জ করেন, ব্যাপার সেখানেই শেষ।
যেভাবেই হোক, চুক্তিতে গ্যাস বিলের অঙ্কটা লিখে রাখুন, যাতে বিল এলে কেউ অবাক না হন।
পানি: সাধারণত বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে
ওয়াসার পানির বিল প্রায়ই আসে পুরো বিল্ডিংয়ের নামে, আর সার্ভিস চার্জের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তাই ভাড়াটিয়া আলাদা পানির বিল দেখেন না। কোনো ফ্ল্যাটের নিজস্ব পানির বিল থাকলে সেটা পোস্টপেইড বিদ্যুতের মতোই সামলান: ভাড়াটিয়া তাঁর সময়ের আসল অঙ্কটা দেবেন।
আপনার দেওয়া বিল ফেরত নেওয়া
কখনো কখনো ভাড়াটিয়ার দেওয়ার কথা এমন বিল আপনি দিয়ে দেন: আপনার নামের বিদ্যুৎ বিল, লাইন কাটা এড়াতে দেওয়া গ্যাস বিল, কিংবা তাঁর কারণে হওয়া ক্ষতির জন্য প্লাম্বার। ঝামেলা ছাড়া ফেরত নেওয়ার উপায়:
- বিল বা রসিদ রেখে দিন। একটা ছবিই যথেষ্ট।
- দেওয়ার সময়েই ভাড়াটিয়াকে জানান, ছবিসহ, যাতে পরে অবাক না হন।
- পরের ভাড়ার সঙ্গে নিন, একই রসিদে আলাদা লাইনে।
যে রসিদে ভাড়া আর বিল আলাদা লেখা থাকে, সেটা ভবিষ্যতের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়:
| বিবরণ | টাকা |
|---|---|
| ভাড়া, সেপ্টেম্বর | ৳২৭,০০০ |
| সার্ভিস চার্জ, সেপ্টেম্বর | ৳৩,০০০ |
| বিদ্যুৎ বিল, আগস্ট | ৳১,৮৫০ |
| মোট পেয়েছি | ৳৩১,৮৫০ |
রসিদ ছাড়া "আলাদা করে" নগদে বিলের টাকা নেওয়া এড়িয়ে চলুন। "গ্যাসের টাকা তো আগেই দিয়েছি" কথাটা ঠিক সেখান থেকেই আসে।
বিলের টাকা আয়ের হিসাবে মেশাবেন না
নিজের হিসাবের জন্য: ভাড়াটিয়া যে বিল ফেরত দেন, সেটা আসলে আয় না, আর তিনি নিজে যে বিল দেন, সেটা আপনার খরচ না। হিসাব ঠিক রাখার একটা কাজের উপায়:
- আপনি যে বিল দেন, সেটা যে মাসের বিল সেই মাসের খরচ।
- বিলের জন্য ভাড়াটিয়া যে টাকা ফেরত দেন, সেটা যেদিন পান সেদিনের অন্যান্য আয়।
- ভাড়াটিয়া সরাসরি যে বিল দেন, সেটা লিখে রাখতে পারেন, কিন্তু আপনার খরচ ধরবেন না।
এভাবে যে মাসে বড় বিদ্যুৎ বিল এসেছে আর ভাড়াটিয়া ফেরত দিয়েছেন, সেই মাসকে লোকসান মনে হয় না, আর বছরের হিসাবে দেখায় ফ্ল্যাট আসলে কত আয় করল।
ওঠা আর নামার দিন: যে রিডিংগুলো বিরোধ ঠেকায়
ওঠার দিন আর বাসা ছাড়ার দিন লিখে রাখুন:
- বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং, আর প্রিপেইড হলে ব্যালান্স
- গ্যাস মিটারের রিডিং বা ব্যালান্স, মিটার থাকলে
- শেষ কোন মাস পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ দেওয়া হয়েছে
- প্রতিটি মিটারের ছবি
দুজনেই কাগজে সই করুন, বা হোয়াটসঅ্যাপে "ঠিক আছে" লিখে দিন। বাসা ছাড়ার দিন বাকি কোনো বিল ভাড়ার সঙ্গে অ্যাডভান্স থেকে কাটা হয় বা নগদে দেওয়া হয়। শেষ হিসাবে এটা কীভাবে বসে, আছে ভাড়াটিয়ার অ্যাডভান্স ন্যায্যভাবে সমন্বয় গাইডে।
চুক্তির একটা ধারা, নিজের মতো বদলে নিন
মাসিক ভাড়া ৳২৭,০০০, সার্ভিস চার্জ ছাড়া। সার্ভিস চার্জ, বর্তমানে মাসে ৳৩,০০০, ভাড়াটিয়া ভাড়ার সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে দেবেন এবং বাড়িওয়ালা তা বিল্ডিং কমিটিকে দেবেন; কমিটি অঙ্ক বদলালে পরের মাস থেকে নতুন অঙ্ক প্রযোজ্য হবে। বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারে, রিচার্জ করবেন ভাড়াটিয়া। নির্দিষ্ট গ্যাস বিল বাড়িওয়ালা দেবেন এবং ভাড়াটিয়া ভাড়ার সঙ্গে তা ফেরত দেবেন। ওঠা ও নামার দিন মিটার রিডিং লেখা হবে।
অঙ্ক আর ব্যবস্থা নিজের ফ্ল্যাট অনুযায়ী বদলে নিন, আর যে চুক্তি নিয়ে নিশ্চিত নন, একজন আইনজীবীকে দিয়ে দেখিয়ে নিন।
Griho যেভাবে সাহায্য করে
Griho প্রতিটি বিল রাখে মাস, অঙ্ক, কে দিয়েছেন আর বিলের ছবিসহ। নিজের দেওয়া বিলে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে নেবেন চালু করা যায়। এরপর ওই ভাড়াটিয়ার ভাড়া লেখার সময় সেগুলো একই নম্বরের রসিদে আলাদা লাইন হিসেবে আসে। আপনার দেওয়া, ফেরত পাওয়া আর ভাড়াটিয়ার সরাসরি দেওয়া বিল আয়ের হিসাবে নিজে থেকেই আলাদা থাকে। দেখুন বিল ও খরচ, রসিদের ছবিসহ।
ছোট চেকলিস্ট
- চুক্তিতে লিখুন ভাড়ায় সার্ভিস চার্জ ধরা কি না, আর বদলালে কী হবে
- ভাড়ার ফ্ল্যাটে প্রিপেইড বিদ্যুৎ আর গ্যাস মিটারই ভালো
- পোস্টপেইড হলে আসল বিলটাই নিন, বেশি না
- শেয়ার করা মিটারের ভাগ লিখে রাখুন
- ভাড়াটিয়ার হয়ে দেওয়া প্রতিটি বিলের ছবি রাখুন
- বিলের টাকা ভাড়ার সঙ্গে, একই রসিদে আলাদা লাইনে নিন
- ওঠা আর নামার দিন মিটার রিডিং লিখে রাখুন